ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও ঘরোয়া প্রতিকার: যা আপনার জানা জরুরি

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই বাংলাদেশে প্রতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। সঠিক সময়ে সচেতন না হলে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে আমাদের সবারই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ এবং এর সঠিক ঘরোয়া যত্ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। আজকের পোস্টে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে ঘরে বসেই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ চিনবেন এবং এর প্রাথমিক যত্ন নেবেন।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ কী কী?

সাধারণত এডিস মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দেয়। নিচে প্রধান প্রধান ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ তুলে ধরা হলো:

তীব্র জ্বর: হঠাৎ করে শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে যেতে পারে এবং এই জ্বর টানা কয়েকদিন থাকতে পারে।

শরীরে তীব্র ব্যথা: ডেঙ্গু হলে জয়েন্টে (গিঁটে) এবং মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এই তীব্র ব্যথার কারণে একে অনেক সময় “হাড় ভাঙা জ্বর”ও বলা হয়।

চোখের পেছনে ব্যথা: চোখের পেছনের অংশে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা এই জ্বরের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

মাথাব্যথা ও ক্লান্তি: তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি শরীর একদম দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

ত্বকে র‍্যাশ বা লালচে দাগ: জ্বর আসার ২ থেকে ৫ দিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে অ্যালার্জির মতো র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।

বমি বমি ভাব: খাবারে অরুচি এবং বারবার বমি হওয়া বা বমি বমি ভাব হতে পারে।

সতর্কতা: যদি মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত হয়, তীব্র পেট ব্যথা হয় কিংবা অনবরত বমি হতে থাকে, তবে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। এগুলো ডেঙ্গুর মারাত্মক বা জটিল অবস্থার লক্ষণ।

ডেঙ্গু জ্বরের ঘরোয়া প্রতিকার ও যত্ন

ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। লক্ষণ দেখে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়া হয়। তবে ঘরোয়াভাবে কিছু নিয়ম মেনে চললে খুব দ্রুত এই রোগ থেকে সেরে ওঠা সম্ভব।

প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খান: ডেঙ্গু হলে শরীরের পানিশূন্যতা রোধ করা সবচেয়ে জরুরি। তাই রোগীকে সারাদিন প্রচুর পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর রস এবং তাজা ফলের জুস খাওয়াতে হবে। তরল খাবার প্লাজমা লিকেজ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

পেঁপে পাতার রস: গবেষণায় দেখা গেছে, পেঁপে পাতার রস ডেঙ্গু রোগীর রক্তে প্লাজমা বা প্লেটলেট (Platelet) কাউন্ট দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করে। কচি পেঁপে পাতা বাটি বা ব্লেন্ড করে দিনে দুবার এক থেকে দুই চামচ রস রোগীকে খাওয়ানো যেতে পারে।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম: এই সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই রোগীকে কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করতে দেওয়া যাবে না। সম্পূর্ণ বিছানায় বিশ্রাম বা বেড রেস্টে থাকতে হবে।

ডালিমের রস ও তরল স্যুপ: ডালিমের রস রক্তশূন্যতা দূর করে এবং শরীরের শক্তি জোগায়। এছাড়া মুরগি বা সবজির গরম স্যুপ রোগীকে খাওয়ালে মুখের রুচি ফেরে এবং শরীর পুষ্টি পায়।

মশারির ভেতর থাকুন: ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সবসময় মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কারণ কোনো সাধারণ মশা যদি ডেঙ্গু রোগীকে কামড়ায়, তবে সেই মশাটি নিজেও ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করবে এবং বাড়ির অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তারাও আক্রান্ত হবে।

মেথি পাতার চা বা মেথি পানি: ডেঙ্গু জ্বরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেথি পাতা দারুণ কাজ করে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। ১ চামচ মেথি দানা বা মেথি পাতা ১ গ্লাস পানিতে ফুটিয়ে চা বানিয়ে রোগীকে দিনে ১-২ বার খাওয়ালে শরীর দ্রুত চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং প্লাজমা লিকেজের ঝুঁকি কমে।

ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল ও অ্যান্ট্রিঅক্সিডেন্ট খাবার: রোগীর শরীরের ভেতরের কোষগুলোকে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে ভিটামিন-সি অত্যন্ত জরুরি। এই সময়ে রোগীকে নিয়মিত আমলকী, লেবু, কমলা, মালটা কিংবা পেয়ারা খেতে দিন। এই ফলগুলোতে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) বাড়াতে এবং ইনফেকশন কমাতে সরাসরি সাহায্য করে।

আরো পড়ুনঃ দাঁত সাদা করার ঘরোয়া উপায়

ডেঙ্গু হলে যা একদমই করা যাবে না

অনেকেই জ্বর হলে সাধারণ জ্ঞান থেকে যেকোনো ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে ফেলেন, যা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক। ডেঙ্গু জ্বর হলে ভুলেও অ্যাসপিরিন  বা আইবুপ্রোফেন  জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। এগুলো রক্ত পাতলা করে দেয়, যার ফলে শরীরের ভেতরে ইন্টারনাল ব্লিডিং বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডোজে প্যারাসিটামল ব্যবহার করুন।

 

সচেতনতাই পারে আমাদের ডেঙ্গু থেকে দূরে রাখতে। আপনার বা পরিবারের কারও মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে প্যানিক বা আতঙ্কিত না হয়ে প্রচুর তরল খাওয়ান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পাশাপাশি বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন, যেন কোথাও পানি জমে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে না পারে। সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।

Leave a Comment